ডায়াবেটিস রোগীর দাঁতের যত্ন

0
65
Close up of dentists angled mirror in womans mouth

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বর্তমান বিশ্বের প্রায় দুই শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশে বর্তমানে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ। ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত শরীরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। ডায়াবেটিস রোগের সঙ্গে মুখের এবং দাঁতের রোগের উল্লেখযোগ্য মিল খুঁজে পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায়। ডেন্টাল ক্যারিজ বা দন্তক্ষয়, মাড়ির রোগ, মুখে বিভিন্ন ধরনের ঘা, কোষ প্রদাহ ইত্যাদি রোগগুলো উল্লেখযোগ্য।

ডায়াবেটিস থেকে দাঁতের রোগ :

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের জিনজিভাইটিস বা মাড়ির প্রদাহ এবং ডেন্টাল ক্যারিজ বেশি হয়। আমরা জানি, শরীরে রক্তপ্রবাহের কাজ হচ্ছে কোষে অক্সিজেন ও অন্যান্য উপকরণ বহন করা এবং অবশিষ্ট বাজে অংশ বের করে আনা, কিন্তু ডায়াবেটিসের কারণে শরীরের রক্তনালীগুলো সরু হতে থাকে। ফলে দেহে রক্তের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয় এবং অক্সিজেন ও অন্যান্য উপকরণ দেহের সব অংশে পৌঁছায় না। এ অবস্থায় মাড়ি ও দাঁতের স্বাভাবিক রক্তের পরিমাণ ও গতি ব্যাহত হয়। এ সময় মাড়ি ফুলে ওঠে এবং কোনো আঘাত লাগলে প্রদাহ দেখা দেয়, তা ছাড়া মাড়িতে আগের কোনো সমস্যা থাকলে তা আরো বৃদ্ধি পায়।

ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর দেহের রোগ প্রতিরোধ শক্তি কমে আসে। ফলে দাঁতের গোড়ায় প্লাক জমা হলে সহজেই মাড়ির প্রদাহ শুরু হয়। এ ছাড়া শরীরে ইনসুলিনের ঘাটতি হলে, আমিষেরও ঘাটতি হয়। ফলে কোষ কলার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যাহত হয়, তাই মুখের কোনো স্থানে ঘা বা প্রদাহ হলে তা সারতে দেরি হয় বা বিঘ্ন ঘটে।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর মুখের লালার সঙ্গে গ্লুকোজ বাড়তি সংযোজনের ফলে ওই গ্লুকোজ মুখে এক ধরনের আণুবীক্ষণিক জীবাণুর সঙ্গে মিলে এক ধরনের এসিড সৃষ্টি করে। সেই এসিড দাঁতের ওপরের শক্ত আবরণ এনামেলকে ক্ষয় করতে থাকে এবং ধীরে ধীরে দাঁতের ভেতরে গর্তের সৃষ্টি করে। এভাবেই ডেন্টাল ক্যারিজ বা দন্তক্ষয় রোগ হয়ে থাকে। এ ছাড়া, মুখের লালার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়, পরিমাণ কমে যায়, ফলে মুখের অতিরিক্ত শুকনো পরিবেশ খাবারের কণাগুলো ধুয়ে মুছে যেতে পারে না। এ খাদ্য কণাগুলো দীর্ঘদিন দাঁতের গায়ে ও মাড়ির ফাঁকে জমে থেকে দাঁত ক্ষয় রোগের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে।

ডায়াবেটিস রোগীর দাঁতের যত্নে করণীয় ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে। রক্তের শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখাই হচ্ছে দাঁত ও মাড়ির রোগ প্রতিরোধের অন্যতম শর্ত। মাড়ির অতিরিক্ত প্রদাহ অনেক সময় ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে অসুবিধার সৃষ্টি করে। যদি মাড়ির প্রদাহ শুরু হয় তবে ওই ঘা শুকাতে অনেক দেরি হয় এবং দীর্ঘ স্থায়ী প্রদাহের কারণেই দাঁত হারাতে হয়।

প্রতি ছয় মাস পর ডেন্টাল সার্জনকে দিয়ে মুখ ও দাঁত পরীক্ষা করাতে হবে। ডেন্টাল সার্জনকে অবশ্যই আপনার ডায়াবেটিস রোগের কথা বলতে হবে। দাঁত ও মাড়ি যাতে সুস্থ থাকে সেজন্য ডেন্টাল সার্জনের কাছ থেকে আপনার দাঁতের যত্নে কী কী করা প্রয়োজন তা অবশ্যই জেনে নিতে হবে। প্রতিদিন দুইবার সকালে এবং রাতে খাওয়ার পর অবশ্যই দাঁত ভালোভাবে ব্রাশ করতে হবে। আপনার ব্যবহৃত ব্রাশের ব্রিসল অবশ্যই নরম হতে হবে। দুই দাঁতের মাঝ থেকে খাদ্যকণা বের করার জন্য ডেন্টাল ফ্লস বা এক ধরনের সুতা ব্যবহার করতে হবে। যদি দাঁত ব্রাশ করার সময় বা খাওয়ার সময় মাড়ি থেকে রক্ত বের হয়, তবে সাথে সাথেই একজন ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ নেয়া উচিত। যে কোনো খাবার বা পানীয় (পানি ছাড়া) খাওয়ার পর অবশ্যই কুলি করতে হবে। মনে রাখবেন, আপনার দাঁত আপনারই, দাঁত সুস্থ রাখার জন্য প্রয়োজন শুধু আপনার একটু সচেতনতা।

আরো পড়ুন : ভাঙা দাঁত কতটুকু ক্ষতিকর

গত দু’বছর আগে মুড়ি খেতে গিয়ে পঞ্চাশোর্ধ্ব রহমান সাহেবের ওপরের চোয়ালের পেছনের দিকের দু’টো দাঁত ভেঙে যায়। কিন্তু তিনি ভ্রুক্ষেপ করলেন না। সমস্যা হলেও এমনিভাবেই দু’টো বছর কাটিয়ে দিলেন। ধীরে ধীরে ব্যথা শুরু হলো। আর ব্যথা হলেই গইইঝ ডাক্তারের কাছ থেকে ব্যথার ওষুধ খেয়েই তিনি আরও বছরখানেক কাটিয়ে দিলেন। এবার হঠাৎ করেই এমন ব্যথা শুরু হলো যে, কোনো ব্যথার ওষুধই কাজে লাগছে না। প্রচণ্ড ব্যথায় রাতে তিনি ঘুমাতে পারলেন না। দিনে ঠিকমতো অফিস করতে পারলেন না। মুখটা এক পাশে ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় অফিসে তার এক অফিস সহকারী সুচিকিৎসার জন্য এক ডেন্টাল সার্জনের কাছে নিয়ে গেলেন এবং তখন রহমান সাহেবের দাঁতের অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে, শেষের দাঁত দু’টো ফেলে দিতে হলো। ফলে তিনি ওই পাশ থেকে খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করতে পারছেন না। সারাক্ষণ তার এত বড় ভুলের খেসারত নিয়ে তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। কথা হলো, শিক্ষিত মানুষ যদি জেনেশুনে এভাবে ভুল করে, তাহলে দেশের জনসাধারণ কী করবে?

ভাঙা দাঁত দীর্ঘ দিন ধরে ব্যথাহীন অবস্থায় থাকতে পারে। যেমন-

– দীর্ঘ দিন ধরে দাঁতে ক্যারিজ বা গর্ত থাকলে যা প্রথম দিকে শির শির অনুভূতি, ঠাণ্ডা-গরম যেকোনো খাবার মুখে নিলে ব্যথা হতে পারে। এক সময় দাঁতের অভ্যন্তরীণ দন্তমজ্জা তার স্বাভাবিক অনুভূতি হারিয়ে ফেলে। এ অবস্থায় দাঁতের আরও কিছুটা অংশ ভেঙে গেলেও কোনো ব্যথা অনুভব হয় না।

– একটি দাঁতের বেশির ভাগ ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার কারণে রুট ক্যানেল চিকিৎসা করার পর ওই দাঁতের ক্যাপ বা ক্রাউন না করা হলে এক সময় সম্পূর্ণ দাঁত ভেঙে যেতে পারে এবং দাঁত ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। এতেও অনেক সময় ব্যথার কোনো অনুভূতি হয় না।

– হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে দাঁত তোলার পর দাঁতের ভাঙা অংশ হাড়ের মধ্যেই বিদ্যমান থাকে এবং দেখা যায় সেখানেও কোনো ব্যথা থাকছে না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অবশ্যই সেই রোগীর ব্যথা হবে এবং ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়বে।

ভাঙা দাঁতের মুখে যেসব সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে :

– ভাঙা দাঁতের ভেতরে অবস্থিত দন্তমজ্জায় পচন ধরার ফলে ধীরে ধীরে সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। যার ফলে পাশের দাঁতের সমস্যা হতে পারে।

– ইনফেকশন বৃদ্ধি পেয়ে মুখের হাড়ে অসটিওমাইলাইটিস জাতীয় জটিল রোগ সৃষ্টি হতে পারে।

– ভাঙা দাঁতের গর্তে বা ফাঁকা স্থানে ঢুকে থাকা খাদ্যকণা মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে।

– ভাঙা দাঁতের ধারালো অংশের ঘর্ষণে জিহ্বার বা গালের নরম অংশে ঘা হতে পারে। এই ঘা কিছু দিন পর ভালো হয়, আবার আঘাতের ফলে সেই ঘা আবার জেগে ওঠে। এভাবে কিছু দিন পর পর এ অবস্থার পুনরাবৃত্তি হতে থাকলে তা ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।

দাঁত ভেঙে গেলেই যে তুলে ফেলতে হবে এমনটি নয়। কারণ দন্ত চিকিৎসা এখন খুবই উন্নত এবং আধুনিক হয়েছে। এক একটি ভাঙা দাঁতকে রাখার জন্য রুট ক্যানেল করে গোরসেলিন বা মেটালিক ক্যাপ করে সংরক্ষণ করা সম্ভব। তাই দুশ্চিন্তার কিছু নেই। সময়মতো সুচিকিৎসাই নিশ্চিত করতে পারে আপনার সুন্দর হাসি। তবে একটি কথা, অবশ্যই অভিজ্ঞ ডেন্টাল চিকিৎসকের সাহায্যেই কাজ করানো উচিত, তা না হলে ভালোর চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে।

LEAVE A REPLY